ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য পদ হারাচ্ছেন হাজী সেলিম

ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য পদ হারাচ্ছেন হাজী সেলিম

মো.রানা সন্যামত:
সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে জরুরি অবস্থার মধ্যে ২০০৭ সালের ২৪ অক্টোবর হাজী সেলিমের বিরুদ্ধে লালবাগ থানায় জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা করে দুদক। ওই মামলায় বিচারিক আদালতের পর হাইকোর্টে দুই দফা শুনানি হয়ে রায় ঘোষণা করেন হাইকোর্ট। হাইকোর্টের রায়ে হাজী সেলিমের ১০ বছরের সাজা বহাল রাখা হয়। তবে সংসদ সদস্য থাকা অবস্থায় দণ্ডিত হওয়ায় হাজী সেলিম স্বপদে থাকতে পারবেন কিনা তা নিয়ে দেখা দিয়েছে সাংবিধানিক প্রশ্ন।

২০০৭ সালের ২৪ অক্টোবর দায়ের করা মামলায় বর্তমান আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হাজী সেলিমের সঙ্গে তার স্ত্রী গুলশান আরাকেও আসামি করা হয়। ওই মামলায় দুটি পৃথক অভিযোগে ২০০৮ সালের ২৭ এপ্রিল হাজী সেলিমকে ১৩ বছরের কারাদণ্ড দেন বিচারিক আদালত। এ রায়ের বিরুদ্ধে ২০০৯ সালের ২৫ অক্টোবর হাজী সেলিম হাইকোর্টে আপিল করেন। ২০১১ সালের ২ জানুয়ারি হাইকোর্টের রায়ে হাজী সেলিমের ১৩ বছরের সাজা বাতিল করে দেওয়া হয়। তবে থেমে থাকেনি দুদক। তাই হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আবেদন জানায় দুদক। ওই আপিল আবেদনের শুনানি শেষে ২০১৫ সালের ১২ জানুয়ারি হাইকোর্টের রায় বাতিল করা হয়। একইসঙ্গে মামলাটির পুনরায় শুনানির জন্য নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। ওই নির্দেশনার ধারাবাহিকতায় প্রায় চার বছর পর ২০২০ সালের ৯ নভেম্বর হাজী সেলিমের আপিল দ্রুত শুনানির জন্য হাইকোর্টে আবেদন জানায় দুদক।

এরপর হাইকোর্ট আপিল আবেদনের শুনানির জন্য গত ১১ নভেম্বর এ মামলার বিচারিক আদালতের নথি তলব করেন। এরপর সেসব নথির ওপর শুনানি নিয়ে আজ মঙ্গলবার (৯ মার্চ) রায় ঘোষণা করলেন হাইকোর্ট।

হাইকোর্টের রায়ে দুদক আইনের মামলায় (২৬-এর ২ ধারা) সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে হাজী সেলিমকে বিচারিক আদালত যে ৩ বছরের কারাদণ্ডাদেশ দিয়েছিলেন, সেই অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় হাজী সেলিমকে তথ্য গোপনের অভিযোগ থেকে খালাস দেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, দুদক এই অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি।

কিন্তু দুদক আইনের ২৭(১) ধারা অনুসারে হাজী সেলিমকে জ্ঞাত আয়বহির্ভূতভাবে সম্পদ অর্জনের অভিযোগে বিচারিক আদালত ১০ বছরের কারাদণ্ডাদেশ দিয়েছিলেন। ওই অভিযোগে তার সাজা বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে ১০ লক্ষ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে ১ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডাদেশের রায় দিয়েছেন আদালত। পাশাপাশি বিচারিক আদালত যেদিন হাইকোর্টের রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি পাবে সেদিন থেকে ৩০ দিনের মধ্যে হাজী সেলিমকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়েছেন। আত্মসমর্পণ না করলে তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করতে বলা হয়েছে। আর যেসব সম্পত্তি নিয়ে এই সাজা প্রদান করা হয়েছে তা বাজেয়াপ্ত করে রাষ্ট্রের অনুকূলে চলে যাবে।

রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছেন, এই মামলায় বিচারিক আদালতে ২০ জন সাক্ষ্য প্রদান করেছেন। সেইসব সাক্ষ্য পর্যালোচনা করা হয়েছে। পর্যালোচনা করে মনে হয়েছে, দুদক আইনের ২৭ (১) ধারা অনুসারে বিচারিক আদালত কর্তৃক হাজী সেলিমকে ১০ বছরের সাজাপ্রদান যথাযথ ও আইনসঙ্গত হয়েছে। তবে এই মামলার অপর আসামি হাজী সেলিমের স্ত্রী গুলশান আরা মারা যাওয়ায় তার আপিল আবেদন বাতিল করে দিয়েছেন হাইকোর্ট।

এদিকে সংবিধানের ৬৬(২-এর ঘ) অনুচ্ছেদ অনুসারে কেউ যদি কেউ নৈতিক স্খলনের দায়ে ২ বছর বা তার বেশি সাজাপ্রাপ্ত হন তবে তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে অযোগ্য হবেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

দুর্নীতির মামলায় হাইকোর্টে কারাদণ্ডাদেশ বহাল থাকার পর সংবিধান অনুসারে হাজী সেলিম তার সংসদীয় পদে বহাল থাকতে পারবেন কিনা তা জানতে চাইলে দুদক আইনজীবী মো. খুরশীদ আলম খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সংবিধানের ৬৬ (২-এর ঘ) অনুচ্ছেদ অনুসারে যদি কেউ নৈতিক স্খলনের দায়ে ২ বছর বা তার বেশি সাজাপ্রাপ্ত হন, তাহলে তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে অযোগ্য হবেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, তিনি যেহেতু দুর্নীতি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত তাই এটা তার নৈতিক স্খলন। তাই সাংবিধানিকভাবে তিনি সংসদ সদস্যপদে থাকার যোগ্যতা হারিয়েছেন। তার সংসদ সদস্যপদ বাদ হয়ে যাবে। তবে এ বিষয়ে স্পিকার সিদ্ধান্ত নেবেন। তাই হাইকোর্টের রায় পাওয়ার পর দুদকের মাধ্যমে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে তা পৌঁছে দেওয়া হবে।

তবে হাজী সেলিমের আইনজীবী সাঈদ আহমেদ রাজা বলেন, আমরা হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল দায়ের করবো। আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত কাউকে চূড়ান্তভাবে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না। সুতরাং তিনি সংসদ সদস্যপদে বহাল থাকতে কোনও বাধা নেই।

এদিকে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান মনির মানবতারকণ্ঠ কে বলেন, পূর্ণাঙ্গ রায় পাওয়ার পর এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সিদ্ধান্ত নেবেন