পি কের ৩৩ সহযোগীর বিরুদ্ধে ১০ মামলা হচ্ছে

পি কের ৩৩ সহযোগীর বিরুদ্ধে ১০ মামলা হচ্ছে

মানবতারকন্ঠ ডেক্স:
প্রশান্ত কুমার (পি কে) হালদার ও তার কথিত দুই বান্ধবীসহ ৩৩ সহযোগীর বিরুদ্ধে ১০টি মামলার অনুমোদন দিয়েছেন দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। একই সঙ্গে পি কের ৩৩ সহযোগীর সম্পদ বিবরণী দাখিলের নোটিস ও ৪৪ জনের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে কমিশন। গতকাল মঙ্গলবার কমিশনের সভায় এসব সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়।

দুদক সচিব ড. মু. আনোয়ার হোসেন হাওলাদার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, এ অভিযোগের অনুসন্ধান করেছেন কমিশনের প্রধান কার্যালয়ের উপপরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধানের নেতৃত্বে চার সদস্যের দল।

অনুসন্ধান দলের সদস্যরা বাদী হয়ে সমন্বিত জেলা কার্যালয় ঢাকা-১-এ দুয়েক দিনের মধ্যে মামলাগুলো করবেন।
দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, পি কে হালদারের অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের বিষয়ে অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসছে নতুন অনেক তথ্য। পি কে হালদারের ‘ছায়া পি কে’ ছিলেন তার কথিত বান্ধবী নাহিদা রুনাই ও অবন্তিকা বড়াল। পি কের ঘনিষ্ঠ মহলে তাদের পরিচিতি ছিল ‘বড় আপা’ ও ‘ছোট আপা’ নামে। তাদের দিয়ে পি কে হালদার সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতাদের ম্যানেজ করে রাখতেন। পি কে উচ্চমহলের আশীর্বাদ পেতে নাহিদা রুনাইকে ব্যবহার করতেন। তাছাড়া তিনি ছিলেন ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের ভাইস প্রেসিডেন্ট। আর অবন্তিকা বড়াল ছিলেন পিপলস লিজিংয়ের নিয়ন্ত্রক।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, পি কে হালদার তার সহযোগীদের জাল এনআইডি দিয়ে নাহিদা রুনাই আহমেদ, রাফসান, সোহাগ, আবদুল আলিমসহ কয়েকজনের সহায়তায় রিলায়েন্স ফাইন্যান্স, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং এবং এফএএস লিজিং থেকে প্রায় দুই ডজন ভুয়া কোম্পানির নামে ২০১৪ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত সময়ে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়ে আত্মসাৎ করেন।

এ টাকার পুরোটাই বিদেশে পাচার করা হয়েছে। দুর্নীতি, জালিয়াতিসহ নানাবিধ অনিয়মের মাধ্যমে ভুয়া ঋণ হিসাবের অনুকূলে ঋণের নামে লেয়ারিং করেন তারা। এভাবে বিভিন্ন ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ক্যাপিটাল মার্কেট থেকে অর্থ সরান পি কে হালদার। এ ক্ষেত্রে ১৪টি প্রতিষ্ঠানের মাত্র দুটি ঠিকানা ব্যবহার করেন পি কে ও তার সহযোগীরা।
দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রাশেদুল হক, ভারপ্রাপ্ত এমডি আবেদ হোসেন, চেয়ারম্যান এমএ হাশেম এবং বোর্ড সদস্যরা অসৎ উদ্দেশ্যে ক্ষমতার অপব্যবহার করেন। তারা প্রতারণার মাধ্যমে যাচাই-বাছাই ছাড়াই ঋণের বিপরীতে কোনো মর্টগেজ নেননি। মর্টগেজ না নিয়ে ১০টি কাগুজে প্রতিষ্ঠানের কথিত মালিককে ঋণ পাইয়ে দিতে সহযোগিতা করেন। যারা মূলত পি কেরই সহযোগী। তারা ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে ঋণের নামে ৭০০ কোটি টাকা তুলে নিয়ে আত্মসাৎ করেন। ওই টাকা লেয়ারিংয়ের মাধ্যমে ভুয়া কোম্পানি এবং বিভিন্ন ব্যক্তির হিসাবে অর্থ স্থানান্তর ও রূপান্তর করেন। যা অর্থ পাচার আইনে অপরাধ। যার পরিপ্রেক্ষিতে দুদক ৩৭ আসামির বিরুদ্ধে ১০টি মামলার সুপারিশ করেছে। প্রত্যেকটি মামলায় প্রধান আসামি হিসেবে সুপারিশ করা হয়েছে পি কে হালদারের নাম।

পি কে হালদার ও তার সহযোগীরা যেসব কাগুজে প্রতিষ্ঠানের নামে অর্থ সরিয়ে নেন সেগুলো হচ্ছে কোলাসিন লিমিটেডের নামে ৬০ কোটি টাকা, লিপরো ইন্টারন্যাশনালের নামে ১৭৪ কোটি, উইন্টেল ইন্টারন্যাশনালের নামে ৬৮ কোটি ৫০ লাখ, ওকায়ামা লিমিটেডের নামে ৮৭ কোটি ৬০ লাখ, আর্থস্কোপ লিমিটেডের নামে ৯৮ কোটি ৯১ লাখ ৩৪ হাজার ৮৮৬, নিউট্রিক্যাল লিমিটেডের নামে ৬০ কোটি, দ্রিনান অ্যাপেয়ারেলসের নামে ৬০ কোটি, কনিকা এন্টারপ্রাইজের নামে ৬০ কোটি, আরবি এন্টারপ্রাইজের নামে ৫৫ কোটি ও ইমোক্সের নামে ৫৮ কোটি টাকা।

প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে দুদক কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরের সঙ্গে আলাপকালে জানান, পি কে নিজে যেমন বান্ধবীদের নিয়ে বিদেশ সফরে যেতেন তেমনি বিভিন্ন সময় দুর্নীতির সহযোগী ও সহকর্মীদের বিভিন্ন দেশে প্রমোদ ভ্রমণে পাঠাতেন। আর এসব উচ্চাভিলাষী ভ্রমণের ব্যয় নির্বাহ করতেন পি কে নিজেই। পি কের অন্যতম বান্ধবী ছিলেন অবন্তিকা বড়াল ও নাহিদা রুনাই। পি কের বিদেশ ভ্রমণে এদের কেউ না কেউ সঙ্গীনি হতেন। তবে দুজনকে একসঙ্গে নিতেন না। আলাদাভাবে দুজনকে নিয়ে ২০ থেকে ২৫ বার সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ড ভ্রমণ করেন পি কে। তার সঙ্গে বিদেশ ভ্রমণ নিয়ে অবন্তিকা ও রুনাইয়ের মধ্যে প্রতিযোগিতা ছিল। পি কে গোপনে অবন্তিকাকে নিয়ে সিঙ্গাপুরে ঘুরতে যান। রুনাই বিষয়টি জানতে পেরে পি কের ওপর চড়াও হন। অবন্তিকাকে নিয়ে গোপনে বিদেশ যাওয়াকে কেন্দ্র করে একবার এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে গিয়ে পি কের সঙ্গে তুমুল ঝগড়া করেন রুনাই। এছাড়া রাতে পি কের বাসায় গিয়ে ভাঙচুরও করেন। এছাড়া অবন্তিকাকে নিয়ে গোপনে বিদেশ যাওয়ার সময় তাকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গিয়ে হাতেনাতে ধরে নিয়ে আসেন। ওই যাত্রায় পি কে-অবন্তিকা বিদেশ না গিয়ে ফিরে আসেন। ঢাকার বিভিন্ন ক্লাবে রুনাই ও অবন্তিকার সঙ্গে পি কে সময় কাটাতেন। পরিচিতজনরা নাহিদা রুনাইকে বড় আপা এবং অবন্তিকা বড়ালকে ছোট আপা বলে ডাকতেন। এছাড়া নাহিদা চালাতেন ইন্টারন্যাশনাল লিজিং আর অবন্তিকা চালাতেন পিপলস লিজিং। অবন্তিকা দুদকের মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে বর্তমানে কারাগারে আছেন।

দুদক কর্মকর্তারা জানান, অবন্তিকা ও নাহিদা ছাড়াও অনামিকা মল্লিক, মহানন্দ তরুয়া, রচনা মন্ডল ও মিরা দেউরিসহ কয়েকজন বান্ধবী তার অর্থ পাচার ও আত্মসাতে সহযোগী হিসেবে কাজ করেন।

৩৩ সহযোগীকে সম্পদ বিবরণী দাখিলের নোটিস : পি কে হালদারের ৩৩ সহযোগীকে সম্পদ বিবরণীর নোটিস জারির অনুমোদন দিয়েছে কমিশন। তাদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী সম্পদের নোটিস জারি করা হয়েছে। যাদের সম্পদ বিবরণী দাখিলের নোটিস দেওয়া হয়েছে তারা হলেন দ্রিনানের চেয়ারম্যান কাজী মমরেজ মাহমুদ ও এমডি মোহাম্ম