সরকারের নিষিদ্ধ এত ইলিশ বাজারে আসে কিভাবে

সরকারের নিষিদ্ধ এত ইলিশ বাজারে আসে কিভাবে

মো: রানা সন্যামত॥
১ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ করেছে সরকার। অথচ বাজারে গেলেই ঝিলিক দিচ্ছে রুপালি ইলিশ। জানা গেছে, প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে ইলিশ ধরছে জেলেরা। কেউ কেউ ‘ম্যানেজ’ করছে প্রশাসনকে। এক্ষেত্রে টাকার বিনিময়ে পাওয়া যাচ্ছে বিশেষ টোকেন। অভিযানে ধরা পড়লে টোকেন দেখালেই পাচ্ছে ছাড়া।

আবার রাতের আঁধারেই চলছে ইলিশের পাইকারি কেনাবেচা। নদীর পাড় সংলগ্ন গ্রামগুলোতে মধ্যরাত ও ভোরে বিক্রি হচ্ছে ইলিশ। ধরা পড়ার ভয় আছে। তাই স্থানীয় বাজারে কম দামেই ইলিশ বিক্রি করে বাড়ি ফিরছেন জেলেরা। গ্রামের সাধারণ মানুষরাও কম দামে ইলিশ কেনার সুযোগটা হাতছাড়া করেন না। তবে কোনওভাবে শহরে এলেই দাম হয়ে যাচ্ছে দ্বিগুণ।

জানতে চাইলে শরিয়তপুর জেলার ভেদরগঞ্জ উপজেলার রামভদ্রপুর গ্রামের জেলে করিম সিকদার জানিয়েছেন, ভিজিএফ-এর চাল তো আমরা সবাই পাই না। পায় তালিকাভুক্ত জেলেরা। মাছ না ধরলে সংসার চালাবো কীভাবে? ঝুঁকি নিয়েই রাতে মাছ ধরতে নামি। পুলিশের ভয়ে বাজারে যাই না। যখন যেখানে যা দাম পাই, তাতেই বিক্রি করি।

পিরোজপুরের পাড়েরহাটের জেলে রুস্তুম হাওলাদার জানিয়েছেন, ‘একটি চক্রকে টাকা দিয়ে টোকেন নিই। সেটা নিয়ে নদীতে নামি। ধরা পড়লে ওটা দেখালে ছেড়ে দেয়।’

টোকেন দেয় কারা জানতে চাইলে রুস্তুম হাওলাদার জানান, তা বলতে পারবো না। চেনাজানা লোক এসে প্রতি সপ্তাহে টাকা নিয়ে যায়।

মাছ বিক্রির বিষয়ে জানালেন, ‘পাইকাররা যোগাযোগ রাখে। অনেকে অগ্রিম টাকা দেয়। তাদের কাছেই ইলিশ বিক্রি করতে হয়। সব রুটিনমাফিক চলে।’

জানা গেছে, জেলা প্রশাসন, কোস্টগার্ডসহ বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে নদীতে অভিযান চালানো হয়। শত শত মণ জাটকাও ধরা পড়ে। তবু কর্তৃপক্ষের চোখ এড়িয়ে অবৈধভাবে মাছ ধরাটা রীতিমতো উৎসবে পরিণত হয়েছে।

ইলিশের অভয়াশ্রম খ্যাত দেশের ৬ জেলার ৫টি এলাকায় ১ মার্চ থেকে সকল প্রকার মাছ ধরা নিষিদ্ধ করেছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। নিষেধাজ্ঞা ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত থাকবে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা আদেশে এ কথা বলা হয়েছে।

পাঁচটি অভয়াশ্রম হলো- চাঁদপুর জেলার ষাটনল হতে লক্ষীপুর জেলার চর আলেকজান্ডার পর্যন্ত মেঘনা নদীর নিম্ন অববাহিকার ১০০ কিলোমিটার এলাকা, ভোলা জেলার মদনপুর বা চর ইলিশা থেকে চর পিয়াল পর্যন্ত মেঘনা নদীর শাহবাজপুর শাখা নদীর ৯০ কিলোমিটার এলাকা, ভোলার ভেদুরিয়া থেকে পটুয়াখালীর চররুস্তম পর্যন্ত তেঁতুলিয়া নদীর প্রায় ১০০ কিলোমিটার এলাকা।

এ ছাড়াও শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া ও ভেদরগঞ্জ উপজেলা এবং চাঁদপুর জেলার মতলব উপজেলার মধ্যে অবস্থিত পদ্মার ২০ কিলোমিটার এলাকা এবং বরিশাল জেলার হিজলা, মেহেন্দীগঞ্জ ও বরিশাল সদর উপজেলার কালাবদর, গজারিয়া ও মেঘনা নদীর প্রায় ৮২ কিলোমিটার এলাকা রয়েছে।

এ সময় এসব নদীতে মাছ ধরা দণ্ডনীয় অপরাধ। আইন অমান্যকারী কমপক্ষে এক বছর থেকে সর্বোচ্চ দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড অথবা পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে।

এ দুই মাস জাটকা আহরণে বিরত থাকা ২ লাখ ৪৩ হাজার ৭৭৮ জন তালিকাভুক্ত জেলের জন্য মাসে ৪০ কেজি করে দুই মাসে ৮০ কেজি ভিজিএফ চাল বরাদ্দ রেখেছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়।

মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ‘বাংলাদেশের মোট উৎপাদিত মাছের প্রায় ১২ শতাংশ আসে ইলিশ থেকে। জিডিপিতে ইলিশের অবদান এক শতাংশের বেশি। ইলিশের ভৌগলিক নিবন্ধনও (জিআই সনদ) পেয়েছে বাংলাদেশ। এ সনদ প্রাপ্তিতে নিজস্ব পরিচয় নিয়ে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের ইলিশ এখন সমাদৃত।

এ প্রসঙ্গে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম জানিয়েছেন, ‘করোনা পরিস্থিতিতেও আমরা মৎস্যজীবীদের জন্য কাজ করছি। আগামীতে আরও বড় পরিকল্পনা নেব। ইতিপূর্বে যেসব জেলে সহায়তা পাননি, এ বরাদ্দ বিতরণের ক্ষেত্রে তাদের অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছি।’