দুদকের জালে গণপূর্তের আলোচিত তিন প্রকৌশলী – মানবতারকন্ঠ

দুদকের জালে গণপূর্তের আলোচিত তিন প্রকৌশলী – মানবতারকন্ঠ

নিজস্ব প্রতিবেদক:
ঢাকা: গণপূর্ত অধিদপ্তরের আলোচিত তিন প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শেষ করেছে দূর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে যে কোন মুহুর্তে মামলা হতে পারে বলে জানা গেছে।
ওই আলোচিত তিন প্রকৌশলী হলেন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এ কে এম সোহরাওয়ার্দী ও নিবার্হী প্রকৌশলী মোহাম্মদ শওকত উল্লাহ। এর আগে তাদের দুদক কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন কর্মকর্তারা।
সূত্র বলছে, গণপূর্তে এক সময়ের অপ্রতিরোধ্য ঠিকাদার হিসেবে পরিচিত জি কে শামিম গ্রেপ্তারের পর দুদক কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদে এই তিন প্রকৌশলীর ব্যাপারে তথ্য দেন জি কে শামিম। এরপর নড়ে চড়ে বসে দুদক। এক এক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় গণপূর্তের শীর্ষ তিন প্রকৌশলীসহ ১৩ কর্মকর্তাকে। তবে ওই তিন প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সম্প্রতি শেষ হওয়া অনুসন্ধানে তাদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনসহ নানা অভিযোগের সত্যতা মিলে।
সূত্র জানায়, বহুল আলোচিত ক্যাসিনো অভিযান শুরুর পর ২০১৯ সালের ২০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর নিকেতন এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হয় গণপূর্ত সিন্ডিকেটের প্রধান জিকে শামীম। তার গ্রেপ্তারের পরই বেরিয়ে আসে তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের নাম।
দুদক সূত্রে জানা যায়, দুদকের বিশেষ অনুসন্ধান ও তদন্ত অনুবিভাগ-২ এর পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেন গত বছর ১২ জানুয়ারি গণপূর্তের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোসলেহ উদ্দিনকে জিজ্ঞাসাবাদের নোটিশ দেন। ১৬ জানুয়ারি তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। নোটিশে তার বিরুদ্ধে অভিযোগের সংক্ষিপ্ত বিবরণীতে ‘জি কে শামীমসহ অন্যান্য ব্যক্তির বিরুদ্ধে সরকারি কর্মকর্তাসহ প্রভাবশালীদের শত শত কোটি টাকা ঘুষ দিয়ে বড় বড় কাজ বাগিয়ে বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, ক্যাসিনো ব্যবসা ও অন্যান্য অবৈধ কর্মকা-ের মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা অবৈধ প্রক্রিয়ায় অর্জনপূর্বক বিদেশে পাচার ও জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে।’ একইভাবে গত বছরের ৮ ডিসেম্বর সৈয়দ ইকবাল হোসেন স্বাক্ষরিত নোটিশ দেয়া হয় নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ শওকত উল্লাহসহ ৮ জনকে। শওকতের বিরুদ্ধেও জি কে শামীমের সঙ্গে যোগসাজশ করে ঘুষ নেয়া ও অবৈধ প্রক্রিয়ায় বিদেশে পাচারের অভিযোগ আনা হয়। তাকেও প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সার্কেল-১ এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী একেএম সোহরাওয়ার্দীকে নোটিশ দেয়া হয় গত বছর ৩১ ডিসেম্বর। তাকেও জিজ্ঞাসাবাদ করে কমিশন।
দুদকের অনুসন্ধান টিমের কর্মকর্তারা জানান, জিজ্ঞাসাবাদে তাদের সঙ্গে জি কে শামীম ও তার সহযোগীদের বিষয়ে নানা তথ্য উঠে আসে। তাদের জিজ্ঞাসাসাদ করার পর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবি আর), বিএফআইইউ, রাজউক, সিটি কর্পোরেশন, ডাক বিভাগসহ বিভিন্ন দফতরে চিঠি দিয়ে তথ্য চাওয়া হয়। সেখান থেকেও বেশ কিছু তথ্য এসেছে বলে জানা যায়। সেগুলো যাচাই-বাছাই করে তাদের জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের প্রাথমিক তথ্য মিলেছে বলে সূত্র জানায়। এর প্রেক্ষিতেই সংশ্লিষ্ট অনুসন্ধান কর্মকর্তা তাদেরকে সম্পদ বিবরণী দাখিলের সুপারিশ করেন।
এদিকে, জিকে শামিমের দেয়া তথ্য ছাড়াও ২০১৯ সালের ২০ নভেম্বর গণপূর্ত অধিদপ্তর কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ঠিকাদারদের পক্ষে সোহেল রানা নামের একজন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোসলেহ উদ্দিনের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে দুদক প্রধান কার্যালয়ে অভিযোগ জমা দেন। ২০১৯ সালের ৫ ডিসেম্বর দুদকে একই ধরনের অভিযোগ দায়ের করেছেন মো. বদরুদ্দীন ওমর নামের আরেক ব্যক্তি। তিনিও অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোসলেহ উদ্দিনের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির নানা রকমের অভিযোগ দিয়েছেন।
২০২০ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর আবারও নানা রকমের অভিযোগ তুলে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোসলেহ উদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ দাখিল করেছেন গণপূর্ত ঠিকাদার সমিতির পক্ষে মো. মোশাররফ হোসেন নামের আরো এক ব্যক্তি।
ওই সকল অভিযোগে বলা হয়েছে‘গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঢাকা জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোসলেহ উদ্দিন আহম্মেদের অনিয়ম ও সীমাহীন দুর্নীতিতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে গণপূর্তের সকল ঠিকাদার ব্যবসায়ী। পুরো অধিদপ্তরে তার পরিচিতি রয়েছে “ফিফটিন পার্সেন্ট” নামে। বর্তমানে প্রতিটি প্রকল্প বাস্তবায়নে এই হারে কমিশন নিয়ে থাকেন তিনি।
দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগে আরও বলা হয়, ক্ষমতার অপব্যবহার করা মোসলেহ উদ্দিন তার ব্যক্তি জীবনে গড়েছেন অঢেল সম্পদের পাহাড়। ঘুষ-দুর্নীতির টাকায় অস্ট্রেলিয়া, কানাডায় কিনেছেন আলিশান বাড়ি, ঢাকা ও কুমিল্লায় একাধিক বাড়ি, ফ্ল্যাট, বিলাসবহুল গাড়ি এবং বিপুল পরিমাণ জমি রয়েছে তার।
অন্যদিকে ২০০২ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত জাতীয় সংসদ ভবনে উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত ছিলেন মোসলেহ উদ্দিন আহম্মেদ। সেই সময় নিয়মবহির্ভূতভাবে সরকারি টাকা খরচ করে আলোচিত হন। তহবিল তছরুপের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে এবং সংসদীয় কমিটির তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়। পরে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার সুপারিশ করা হয়।
এ ব্যাপারে দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আরিফ সাদেক বলেন, বিষয়টি তিনি এখনো জানেন না।বিষয়টি জেনে বিস্তারিত জানাতে পারবেন বলে জানান তিনি।