প্রতারণা ও জালিয়াতির অভিযোগে এহসান গ্রুপের চেয়ারম্যান গ্রেফতার

প্রতারণা ও জালিয়াতির অভিযোগে এহসান গ্রুপের চেয়ারম্যান গ্রেফতার

মানবতারকণ্ঠ রিপোর্ট:
সাম্প্রতিক সময়ে এমএলএম কোম্পানীর নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনায় ভুক্তভোগীদের ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, সিলেট, পিরোজপুরসহ বেশ কয়েকটি জেলায় মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলন ও বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমেও বর্ণিত প্রতারণার ঘটনা প্রচারে দেশব্যাপী চাঞ্চল্য ও আলোড়নের সৃষ্টি হয়। বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগীও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নিকট অভিযোগ দায়ের করেন। ফলশ্রæতিতে র‌্যাব ছায়া তদন্ত শুরু করে ও গোয়েন্দা নজরদারী বৃদ্ধি করে।

এরই ধারাবাহিকতায় গত ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২১ তারিখ রাতে র‌্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা ও র‌্যাব-১০ এর একটি আভিযানিক দল রাজধানী ঢাকার শাহাবাগ থানাধীন তোপখানা রোড এলাকায় একটি অভিযান পরিচালনা করে রাগীব আহসান (৪১), পিতা-আব্দুর রব, থানা ও জেলা-পিরোজপুর ও তার সহযোগী মোঃ আবুল বাশার খান (৩৭), পিতা-আব্দুর রব, থানা ও জেলা-পিরোজপুরকে গ্রেফতার করে। এসময় তাদের নিকট থেকে উদ্ধার করা হয় ভাউচার বই ও মোবাইল ফোন ইত্যাদি।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃত রাগীব আহসান তার প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য প্রদান করেন। জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, গ্রেফতারকৃত রাগীব আহসান ১৯৮৬ সালে পিরোজপুরের একটি মাদ্রাসায় অধ্যায়ণ শুরু করেন। পরবর্তীতে সে ১৯৯৬-১৯৯৯ পর্যন্ত হাটহাজারীর একটি মাদ্রাসা হতে দাওরায়ে হাদিস এবং ১৯৯৯-২০০০ পর্যন্ত খুলনার একটি মাদ্রাসা হতে মুফতি সম্পন্ন করেন। অতঃপর সে পিরোজপুরে একটি মাদ্রাসায় চাকুরী শুরু করেন। ২০০৬-২০০৭ সালে তিনি ইমামতির পাশাপাশি “এহসান এস মাল্টিপারপাস” নামে একটি এমএলএম কোম্পানীতে ৯০০ টাকা বেতনের চাকুরী করতেন। মূলত এই প্রতিষ্ঠানে চাকুরীর সুবাদে এমএলএম কোম্পানীর আদ্যপ্রান্ত রপ্ত করেন। পরবর্তীতে নিজে ২০০৮ সালে “এহসান রিয়েল এস্ট্রেট” নামে একটি এমএলএম কোম্পানী প্রতিষ্ঠা করেন।

জিজ্ঞাসাবাদে আরো জানা যায়, সে মূলত ধর্মীয় আবেগ/অনুভূতিকে অপব্যবহার করে এমএলএম কোম্পানীর ফাঁদ তৈরী করে। তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তের ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষ, ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যুক্ত ব্যক্তিবর্গ, ইমাম শ্রেণী ও অন্যান্যদের টার্গেট করে প্রতারণার ফাঁদ তৈরী করেন। তিনি “শরিয়ত সম্মত সুদবিহীন বিনিয়োগ” এর বিষয়টি ব্যাপক প্রচারণা করে গ্রাহকদের আকৃষ্ট করেন। এছাড়াও তিনি ওয়াজ মাহফিল আয়োজনের নামে ব্যবসায়িক প্রচার প্রচারণা করতেন। তিনি লক্ষ টাকার বিনিয়োগে মাসিক মাত্রাতিরিক্ত টাকা প্রাপ্তির প্রলোভন দেখান। তিনি ২০০৮ সালে ১০,০০০ গ্রাহককে যুক্ত করতে সমর্থ হন বলে জানান। এখন গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় লক্ষাধিক বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়।

জিজ্ঞাসাবাদে আরো জানা যায়, গ্রেফতারকৃতের প্রায় তিন শত কর্মচারী রয়েছে। যাদেরকে কোন প্রকার বেতন প্রদান করা হয় না। কর্মচারীররা মাঠ পর্যায় হতে বিনিয়োগকারী গ্রাহক সংগ্রহ করে থাকেন। তাদেরকে গ্রাহকের বিনিয়োগের ২০% অর্থ প্রাপ্তির প্রলোভন দেখানো হয়েছে। ফলশ্রæতিতে সে দ্রæত গ্রাহক সংখ্যা বৃদ্ধিতে সক্ষম হন। তবে তিনি এখন কর্মচারী, গ্রাহক সকলকেই প্রতারিত করেছেন।

গ্রেফতারকৃত রাগীব আহসান জানান তিনি ১৭টি প্রতিষ্ঠানের নামে প্রতারণার ফাঁদ তৈরী করেন। উক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো হলো ঃ (১) এহ্সান গ্রæপ বাংলাদেশ, (২) এহ্সান পিরোজপুর বাংলাদেশ (পাবলিক) লিমিটেড, (৩) এহ্সান রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড বিল্ডার্স লিমেটেড, (৪) নূর-ই মদিনা ইন্টারন্যাশনাল ক্যাডেট একাডেমি, (৫) জামিয়া আরাবিয়া নূরজাহান মহিলা মাদরাসা, (৬) হোটেল মদিনা ইন্টারন্যাশনাল (আবাসিক), (৭) আল্লাহর দান বস্ত্রালয়, (৮) পিরোজপুর বস্ত্রালয়-১ ও ২, (৯) এহ্সান মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড, (১০) মেসার্স বিসমিল্লাহ ট্রেডিং অ্যান্ড কোং, (১১) মেসার্স মক্কা এন্টারপ্রাইজ, (১২) এহ্সান মাইক অ্যান্ড সাউন্ড সিস্টেম, (১৩) এহ্সান ট্যুর অ্যান্ড ট্রাভেলস, (১৪) ইসলাম নিবাস প্রজেক্ট, (১৫) এহ্সান পিরোজপুর হাসপাতাল, (১৬) এহ্সান পিরোজপুর গবেষণাগার, (১৭) এহ্সান পিরোজপুর বৃদ্ধাশ্রম। ভূক্তভোগীরা দাবী করেন এই সমস্ত প্রতিষ্ঠানের নামে অর্থ সংগ্রহ করে তিনি পরিবারের সদস্য ও নিকট আত্মীয়দের নামে/বেনামে সম্পত্তি ও জায়গা জমি করেছেন। এতদ্সংক্রান্ত বিষয়ে বিশদ অনুসন্ধান প্রয়োজন।

গ্রেফতারকৃতকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, তিনি তার পরিবারের সদস্যদের নাম যুক্ত করে ব্যবসায়িক কাঠামো তৈরী করেন। তিনি উল্লেখ করেন তার নিকট আত্মীয়দের মধ্যে শ্বশুর প্রতিষ্ঠানের সহসভাপতি, পিতা প্রতিষ্ঠানের উপদেষ্টা, ভগ্নিপতি প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার। এছাড়া রাগীব আহসানের ০৩ ভ্রাতার মধ্যে গ্রেফতারকৃত আবুল বাশার প্রতিষ্ঠানের সহ-পরিচালক, বাকী দুই ভাই প্রতিষ্ঠানের সদস্য। এভাবে তিনি ব্যাপক অনিয়ম করেছেন বলে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছেন।
গ্রেফতারকৃত রাগীব আহসানকে জিজ্ঞাসাবাদে জানায়, সে গ্রাহকদের সংগৃহিত অর্থ হাউসিং, ল্যান্ড প্রজেক্ট, ব্যবসায়িক দোকান, ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের আড়ালে সাধারণ গ্রাহকদের কষ্টার্জিত অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। তিনি এখন পর্যন্ত জিজ্ঞাসাবাদে ১১০ কোটি টাকা সংগ্রহের স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। এ বিষয়ে বিস্তর জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন রয়েছে।

গ্রেফতারকৃত রাগীব আহসান বিভিন্নভাবে গ্রাহকদের প্রতারিত করতেন। এক্ষেত্রে তিনি চেক জালিয়াতি করতেন। অনেকেই পাওনা টাকার চেক নিয়ে ব্যাংকে গিয়ে প্রতারিত হয়েছেন। এছাড়া অনেকেই ভয়ভীতি, লাঞ্চিত ও নির্যাতিত হতেন বলে ভূক্তভোগীরা জানায়। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় বেশ কয়েকটি মামলা রয়েছে। এতদ্সংক্রান্ত বিভিন্ন অত্যাচারে ও নির্যাতনের কাহিনী মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলন ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে উঠে আসে।

গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন।