দক্ষিণাঞ্চলের চাল পাচ্ছে না জেলেরা, বাদ পড়েছে কয়েক লাখ লাখ জেলে। মানবতারকণ্ঠ

দক্ষিণাঞ্চলের চাল পাচ্ছে না জেলেরা, বাদ পড়েছে কয়েক লাখ লাখ জেলে। মানবতারকণ্ঠ

এস এল টি তুহিন,বরিশাল।
সমস্যা দুটি, প্রথমত : সরকারের করা তাঌলিকা থেকে বাদ পড়েছে দক্ষিণাঞ্চলের কয়েক লাখ জেলে। মৎস্যসম্পদের উন্নয়নে বিভিন্ন সময়ে মাছ ধরা বন্ধসহ সরকারের দেওয়া নিষেধাজ্ঞার সময় যেসব সহায়তা দেওয়া হয় তার কিছুই পায় না এরা। আবার যাদের তালিকায় নাম রয়েছে তাদেরও একটি বড় অংশ বাদ পড়ছে সরকারি সহায়তা থেকে। কর্মকর্তারা সোজাসাপ্টা বলে দেন ঢাকা থেকে তাদের নামে বরাদ্দ আসেনি।

এই যে ১ মার্চ থেকে অভয়াশ্রমে মাছ ধরা বন্ধ, এবারও কিন্তু ঘটছে একই ঘটনা। বরিশাল বিভাগের ৬ জেলার লাখখানেক জেলে পাচ্ছে না কোনো সাহায্য-সহযোগিতা। অথচ সরকারের করা তালিকায় নাম থাকাসহ জেলে কার্ড রয়েছে তাদের। এই লক্ষাধিক জেলেকে যেমন সহায়তা দিতে হবে তেমনি সব জেলের নাম তালিকায় তুলতে হবে। না হলে নিষেধাজ্ঞা চলাকালে পেটের টানে এদের আইন ভেঙে নদীতে নামা বন্ধ করা যাবে না।

১ মার্চ থেকে দেশের ৬টি অভয়াশ্রমে শুরু হওয়া দুই মাসব্যাপী মাছ ধরা বন্ধের সর্বশেষ পরিস্থিতি জানতে চাইলে এভাবেই জেলেদের সমস্যা তুলে ধরেন বাংলাদেশ ফিশিংবোট মালিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী। তালিকায় নাম না ওঠা কিংবা নাম থাকলেও সরকারি সহায়তা না পাওয়ার এই চিত্র পুরো দক্ষিণাঞ্চল জুড়ে। মৎস্য অধিদপ্তরের করা তালিকায়ও উঠে এসেছে এই বিষয়টি। যদিও গত বছরের তুলনায় এবার কমেছে সরকারি সহায়তা না পাওয়া জেলের সংখ্যা।

গত বছর জাটকা নিধনে নিষেধাজ্ঞা চলাকালে বরিশাল বিভাগের ৬ জেলায় মোট ২ লাখ ১ হাজার ৭১ জন জেলেকে দেওয়া হয় মাসে ৪০ কেজি করে চাল। অথচ সরকারের করা তালিকাতে এই ৬ জেলায় জেলের সংখ্যা ৩ লাখ ১১ হাজার ৫১ জন।
সেই হিসাবে সরকারি সহায়তা পায়নি ১ লাখ ১০ হাজারের বেশি জেলে। এ বছর অবশ্য খানিকটা উন্নতি হয়েছে সেই পরিস্থিতির। চলতি ২ মাসের মাছ ধরা নিষেধাজ্ঞায় এবার সরকারি সহায়তার চাল পাচ্ছে ২ লাখ ৪৯ হাজার ১০২ জন জেলে। গত বছরের তুলনায় সহায়তা পাওয়া জেলের সংখ্যা বাড়লেও তালিকায় নাম থাকার পরও চাল পাচ্ছে না প্রায় ৬২ হাজার জেলে।

বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলা জাতীয় মৎস্যজীবী জেলে সমিতির সভাপতি আ. জব্বার কাঁকন বলেন, ‘তালিকায় নাম থাকার পরও সহায়তা না পাওয়াই কেবল নয়, এমন অনেক জেলে রয়েছেন যাদের নাম তালিকায় ওঠেনি।

আমার উপজেলায় মোট জেলের সংখ্যা ৪০ হাজারের মতো। অথচ তালিকায় উঠেছে ২৮ হাজারের নাম। বাকি ১২ হাজার জেলে কখনোই কোনো সুবিধা পায় না সরকারের কাছ থেকে।’

মেহেন্দীগঞ্জের এই চিত্রই পুরো বরিশাল বিভাগ জুড়ে। বরগুনা জেলা মৎস্যজীবী সমিতির একাধিক নেতা বলেন, ‘সাগর পাড়ের এই জেলায় কম করে হলেও দেড় লাখ জেলে রয়েছে। অথচ পুরো জেলা মিলিয়ে সরকারি তালিকায় জায়গা পেয়েছে মাত্র ৩৯ হাজার ৮শ জন।

পাথরঘাটা জেলে সমিতির নেতা দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমাদের উপজেলায় মাত্র সাড়ে ১২ হাজার জেলের নাম উঠেছে সরকারি তালিকায়। প্রকৃতপক্ষে এই সংখ্যা ২৫ হাজারেরও বেশি।’

ক্ষুদ্র মৎস্যজীবী জেলে সমিতির কেন্দ্রীয় সদস্য শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘এভাবে হিসাব করলে পুরো বিভাগে জেলের সংখ্যা ৫ লাখ ছাড়িয়ে যাবে। অথচ সরকার যে তালিকা করেছে তাতে জেলের সংখ্যা দেখানো হয়েছে মাত্র ৩ লাখ। মাছের উৎপাদন বাড়াতে প্রায় পুরো বছর জুড়েই নানা নিষেধাজ্ঞা দেয় মৎস্য বিভাগ। নিষেধাজ্ঞা চলাকালে নদীতে নামতে পারে না জেলেরা।

কর্মহীন সেই সময়ে জেলেদের জীবনধারণের অন্যতম উপায় হয়ে দাঁড়ায় সরকারি সহায়তা। তালিকায় নাম না থাকা এবং থাকার পরও বরাদ্দ না থাকায় জেলেরা যখন সেই সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয় তখন আইন ভেঙে নদীতে জাল ফেলা ছাড়া তাদের আর কিছুই করার থাকে না।

সরকারি সহায়তা বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি অভয়াশ্রমে মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা চলার বর্তমান সময়ে আরও একটি বড় জটিলতায় ভুগছে দক্ষিণের জেলেরা। বরিশালে থাকা ষষ্ঠ অভয়াশ্রমসহ দেশের দক্ষিণ উপকূলের নির্দিষ্ট মোট ৬টি অভয়াশ্রমে চলছে এই নিষেধাজ্ঞা।

গত ১ মার্চ থেকে শুরু হওয়া নিষেধাজ্ঞার আওতায় আগামী ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত কোনো ধরনের মাছ শিকার করতে পারবে না জেলেরা। বরিশাল সদর উপজেলার ২টি নদীর ১৮ কিলোমিটার এলাকা পড়েছে এই নিষেধাজ্ঞার আওতায়।

সরকারিভাবে নিষেধাজ্ঞা জারি থেকে শুরু করে তা কার্যকরে নানা ব্যবস্থা নেওয়া হলেও নদীর কোনো কোনো অংশ অভয়াশ্রমের আওতায় পড়েছে তা চিহ্নিত করা না থাকায় বিপাকে পড়ছে জেলেরা। অভয়াশ্রমের আওতাধীন নয় ভেবে নিষেধাজ্ঞার এলাকায় মাছ ধরতে ঢুকে জেল জরিমানার শিকার হচ্ছে তারা। বরিশাল সদর উপজেলার টুংগিবাড়িয়া এলাকার বাসিন্দা জেলে মোকসেদ সিকদার বলেন, ‘আমাদের বলা হয়েছে আড়িয়াল খাঁ এবং কালাবদর নদের কিছু অংশে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে কিছু অংশে নেই।

আন্দাজে মাছ ধরতে নেমে এরইমধ্যে নৌ পুলিশের ধাওয়া খেয়েছি। এখানে যদি লাল পতাকা কিংবা অন্য যে কোনো চিহ্ন দিয়ে বোঝানো হত যে কতটুকুতে মাছ ধরা যাবে না তাহলে আমাদের আর এই সমস্যায় পড়তে হতো না।’

কেবল বরিশালই নয়, পুরো দক্ষিণাঞ্চল জুড়ে যতগুলো অভয়াশ্রম রয়েছে তার প্রায় সব কটিতেই বিরাজ করছে এই সমস্যা।

১ মার্চ নিষেধাজ্ঞা শুরু হওয়ার ২ দিন পর গত ৩ মার্চ অনুষ্ঠিত টাস্কফোর্সের সভায় অভয়াশ্রম এলাকা চিহ্নিতকরণের সিদ্ধান্ত হলেও গত ২৫ দিনেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।

জানতে চাইলে মৎস্য অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় উপ-পরিচালক আনিসুর রহমান তালুকদার বলেন, ‘অভয়াশ্রম চিহ্নিত নেই এটা ঠিক নয়। তবে দক্ষিণাঞ্চল যেহেতু নদী ভাঙনপ্রবণ এলাকা তাই নদী তীরে স্থাপিত চিহ্নিতকরণ খুঁটি অনেক সময় নদীগর্ভে হারিয়ে যায়। আমরা চেষ্টা করছি এই সমস্যার একটি স্থায়ী সমাধান করতে।’ তালিকায় নাম না থাকা এবং নাম থাকার পরও সরকারি সহায়তা না পাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আসলে সরকারি বরাদ্দ অনুযায়ী চাল বিতরণ করি আমরা।

চাহিদা এবং বরাদ্দের হেরফেরে কিছু সমস্যা তৈরি হয়। তবে আমরা বলে দিয়েছি যে, এবার যারা চাল পাচ্ছে তাদেরকে আগামীতে না দিয়ে যারা পায়নি তাদের দিতে। এতে সবার সহায়তা প্রাপ্তি নিশ্চিত হবে।’

অনেক জেলের নাম তালিকায় না ওঠা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তালিকা তো একটা চলমান প্রক্রিয়া। যাদের নাম ওঠেনি পরবর্তীতে উঠবে। আবার কেউ মারা গেলে নাম বাদ যাবে। আসলে প্রথম যখন এই তালিকা তৈরি করা হয় তখন অনেকেই বিষয়টিতে গুরুত্ব দেয়নি। এখন যখন দেখছে যে তালিকাভুক্তরা নানা সহায়তা পাচ্ছেন, তখন তালিকায় নাম ওঠানোর জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন। তবে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। সবার নামই পর্যায়ক্রমে তালিকায় উঠবে।